অন্নপূর্ণা বেজক্যাম্প ট্রেক চতুর্থ দিন

অন্নপূর্ণা বেজক্যাম্প ট্রেক চতুর্থ দিন

Sharing is caring!

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮


তাদাপানি থেকে আপার সিনুয়া


তিনদিনের পুনহিল লুপ শেষ করে এবার সোজা গন্তব্যের পথে। সব ঠিক থাকলে ৩/৪ দিনের মাথায় বেজক্যাম্পে থাকবো। গত তিনটা দিন কিভাবে কেটেছে বোঝার উপায় ছিল না। সারাদিন হেঁটেছি, রাতে ঘুমিয়েছি মাঝে কিছুটা সময় আড্ডা আর খাওয়া দাওয়াতে কেটেছে৷
গোরেপানির লজ টা অন্নপূর্ণা ট্রেকে সবচে বেষ্ট ছিল, তারপর কেন জানি কোন লজ চোখে ধরেনাই৷ তাদাপানি জায়গাটা বেশ ক্রাউডেড। ছোট কয়েকটা ট্রেকের হাব বলা যায় এটাকে। তারপরেও রুম খুব সহজে পেয়ে গেলাম।


তিনদিন হাঁটার পর কিছুটা অভ্যাস্থ হয়ে উঠেছি। হাঁটুর ব্যাথাটা কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠেছে। গোসুল করে ফায়ারপ্লেসে বসে বেশ আড্ডা দিলাম। কার্ড খেলতে জানিনা, সেদিন জেনেসা নতুন ২-৩ টা কার্ড গেম খেলা শেখালো৷ অবসরে বই পড়ার জন্য কিন্ডল নিয়ে গেছিলাম, কিন্তু আড্ডায় বইয়ের এক পাতাও পড়তে পারিনি।


কার্ড খেলতে গিয়ে সেদিনের আড্ডায় পরিচয় হল এক কানাডিয়ান ভদ্রলোকের সাথে। সে অন্নপূর্ণা সার্কিট শেষ করে এখন বেজক্যাম্প যাবে। পাহাড়ে একদিনে ২৫ কি.মি তার বেষ্ট ছিল! পরে কিউরিয়াস হয়ে বয়স জিগাইলাম। তার বয়স ৬৫ বছর! তিনটা মেয়ে আছে ছোটটা আমার থেকে বড়! যাইহোক সে আমাদের থেকে ৪০% ফাস্ট। পরের দিন গুলোতে ওর কথা চিন্তা করেই মোটিভেট করতাম নিজেকে।


ভোরে উঠে অন্নপূর্ণা সাউথ,হিনচুলি, ফিসটেইল মাউন্টেন দেখে নাস্তা শেষ করে রওনা দিলাম। লক্ষ্য ছিল চমরং পর্যন্ত যাব। শুরুতে অনেকটা পথ নিচে নামা, এরপর শুরু হল উপরে উঠা।প্রথমেই চোখে পড়লো বিশাল সাসপেনশন ব্রিজ। আমার ট্রেকের সবচেয়ে পছন্দের জিনিষ ছিল এই ব্রিজ গুল। পেলেই পাগলের মত খুশি লাগতো৷ বিশাল লম্বা ব্রিজ ঝুলতেসে আর নিচে বিশাল খাদ। যদি ছিড়ে যায় ভাবতেই কেমন থ্রিল অনুভব হয়।


পথের মাঝে একসময় গিয়ে দুটা রাস্তা দুইদিকে ভাগ হয়ে গেছে৷ কোনটা চমরং এর বুঝে পেলাম না। সেখানেই লজ ছিল একটা, তাকে জিগাইলাম কোন দিকে চমরং৷ তার দেখিয়ে দেয়া রাস্তায় শুরু হল হাঁটা।


এর আগে হাঁটার সময় প্রতি ১৫-২০ মিনিট পর পর কারো কারো দেখা পেয়েছি। এই রাস্তায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেল কাউকে দেখতে পাইনা। কি মনে করে ম্যাপ ওপেন করলাম। দেখলাম ম্যাপের রুটের একদম উল্টাপথে হেঁটে এসেছি অনেকটা। একটু ঘাবড়ে গেলাম, দাড়িয়ে কিছুক্ষণ ভাবলাম কি করবো৷ তারপর ম্যাপ বের করে আবার রুট ঠিক করলাম দেখলাম রাস্তা আছে এই পথে। ঘাবরে যাবার কারণ হল কোন নেটওয়ার্ক নাই ফোনে, কাউকে বার্তা পাঠানোর সুযোগ ও নাই৷ অফলাইন ম্যাপ টা ভাগ্যিস ছিল, সেটাই অন্ধকারে আলোর কাজ করেছিল। শেষ মুহুর্তে আবার দুই রাস্তার মোড়ে এসে দাড়ালাম৷ এবার ম্যাপেও কোন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। শেষমেষ ধারনা করে গেলাম। আরো ঘন্টাখানেক পর সামনে কিছু মানুষ দেখে বুকে বল পেলাম।


একদম দুপুরের আগ মুহুর্তে এসে চমরং পৌঁছালাম। শেষ সিঁড়ি বেয়ে যখন উঠছি, জেনেসা চিল্লায়ে ডাকতেসে সাজেদ! মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের ফিরে পাবার মত৷ পরে জানলাম তারাও আমার মত ট্রেডিশনাল রাস্তায় না গিয়ে এই রাস্তাতে এসেছে৷
যে রেস্টুরেন্ট টা তে থেমেছি সেটা একদম পাহাড়ের ধারে। নিচে তাকালে সোজা খাদ চোখে পড়ে। সেখানে অনেকক্ষন দম নিয়ে লাঞ্চ সেরে রওনা দিলাম৷ অলস দুপুরে একটা ঘুম দিতে পারলে বেশ হত। যেহেতু দুপুর হতে হতে চলে এসেছি চমরং আজকে সিনুয়া পর্যন্ত যাই। তাই ঠিক করলাম সিনুয়া যাব।


চমরং এর মাঝামাঝি চেকপোষ্ট আছে। সেখানে দাড়িয়ে সিনুয়া চোখে পড়ে। নিচে নামতে হবে অনেকটা পথ, এরপর আবার উঠা। নিচে যতটা নামতে হবে ততটাই চড়া। চেকপোষ্টে বললো তিনঘন্টা লাগবে৷ ঘড়ি দেখলাম ৩ টা বাঝছে। আরো তিন ঘন্টা হাঁটার জন্য শরির সায় দিচ্ছে না৷ কেন জানি দুপুরের খাবার খেয়ে শরির ছেড়ে দিয়েছে, এখন একটু আরাম দরকার।
কিছু করার নাই শুরু করলাম। পথে অগনিত ঝর্না চোখে পড়লো। নামতে গিয়ে চমরং গ্রামটার প্রেমে পড়ে গেলাম। অনেক গুছানো আর সবগুলো লজ কালারফুল। নিচে নেমেই চোখে পড়লো ধান ক্ষেতের। ধান কেবল পাকা শুরু করেছে। বাংলাদেশের মাটিতে এর চারগুন বেশি শিষ হয় ধানের। আমরা কতটা ভাগ্যবান চিন্তা করা যায়না।


পথে দেখা হল দুই পোর্টারের সাথে। তাদের কাধে বিশাল ব্যাগ, আমি ছোট ব্যাগ নিয়েও তাদের সাথে তাল মিলাতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। চমরং থেকে সিনুয়া পর্যন্ত ওদের সাথে গল্প করতে করতে গেছি। আমার হিন্দি শুনে একপর্যায়ে বললো তোমরা হিন্দি তে কথা বল নাকি! বললাম না বাংলায় বলি, এখন ছোটবেলা থেকে সবকিছুই তো হিন্দি দেখে দেখে বড় হয়েছি। আর এখন বলিউড মুভি তাই হিন্দি বুঝি বলতে পারি কিছুটা।


সন্ধ্যার আলো নিভু নিভু এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছালাম সিনুয়াতে। সিনুয়াতে লজ পাওয়া খুব কষ্টকর। ভাগ্যিস অনেক আগে জেনেসা আর ক্রিস্টেন গিয়েছিল, তারাই লজ ঠিক করে রেখেছিল। সিনুয়াতে আমাদের রুমে এক কোরিয়ান ছেলেকে থাকার জায়গা দেয়া হয়েছে। ওর নাম অনেক বড়, পরে শুধু “কু ” বলে ডাকতে বললো। কু এর মত কেয়ারিং মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। কোরিয়ান রা এত ফ্রেন্ডলি আর কেয়ারিং হয় তা কু এর সাথে দেখা না হলে কোন দিন বুঝতে পারতাম না। আমাদের টিমে সিনুয়াতে আরো দুজন এড হল। গুসতাভো মলের রদরিগেজের কথা আরেকদিন বলবো৷


সিনুয়ার পর আর ঘোড়া যায় না উপরে। তাই খাবার থেকে শুরু করে সব পোর্টার রা মাথায় করে নিয়ে যায়৷ এ কারণে সিনুয়ার পর সবকিছুর দাম অনেক বেশি। আর সিনুয়ার পর নন ভেজ খাওয়া নিষেধ। মুরগি, মহিষ কোনকিছুর মাংসই এলাউড না। কারণ মাংস খেলে নাকি পাহাড়ে বিপদ হয়, পুরানো ধারনা অনুসারে। সিনুয়াতে পেটভরে ডালভাত খেয়ে ঘুম দিলাম সেদিন।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *